ভারতীয় পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন বিক্ষোভ, স্লোগান এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) লোকসভার ভেতরে বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ এবং বাইরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের মধ্যেই দেশটির পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অধিবেশন শুরু হতেই নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে লোকসভার ‘ওয়েল’-এ নেমে আসেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তবে এই বিক্ষোভে অংশ নেননি ২৬ জন সংসদ সদস্য। তারা নিজেদের আসনে বসেই অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করেন। এই ২৬ জনের মধ্যে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ২০ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য, যারা সম্প্রতি ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-তে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া শিবসেনা (ইউবিটি) থেকে একনাথ সিন্ধের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দেওয়া ছয়জন সংসদ সদস্যও বিক্ষোভে অংশ নেননি।
মাত্র তিন মাস আগে তৃণমূল কংগ্রেস কংগ্রেসের সঙ্গে একযোগে সরকারের আনা ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার দলটির মধ্যে বিভক্তির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহুয়া মৈত্রসহ কয়েকজন তৃণমূল সংসদ সদস্য ‘Paper Leak, Stop NEET’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে কংগ্রেসের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিলেও বিদ্রোহী নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার অনুসারীরা নিজেদের আসনে বসে থাকেন।
বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের দাবির পর স্পিকার ওম বিড়লা লোকসভার আসন বিন্যাসেও পরিবর্তন আনেন। নতুন বিন্যাসে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী শিবিরের সামনের সারিতে বসানো হয়। অন্য বিদ্রোহী সদস্যদেরও নতুন ব্লকে স্থান দেওয়া হয়, যেখানে এনডিএ জোটের শরিক দলগুলোর সদস্যরাও ছিলেন।
অধিবেশন চলাকালে তৃণমূলের দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা দেখা যায়নি। বরং বিদ্রোহী নেতাদের একাধিক বিজেপি নেতার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তৃণমূলের অভিযোগ, তাদের দলে এই বিভাজনের পেছনে ক্ষমতাসীন বিজেপির ভূমিকা রয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনেও ছিল ভিন্নতা। কংগ্রেস নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও রামমন্দিরের অনুদান কেলেঙ্কারির অভিযোগকে সামনে এনে বিক্ষোভ করে। অন্যদিকে ডিএমকের সংসদ সদস্যরা কাবেরী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ইস্যুতে প্রতিবাদ জানান। সমাজবাদী পার্টিও বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করলেও কংগ্রেসের সঙ্গে ‘ওয়েল’-এ নেমে যৌথ বিক্ষোভে অংশ নেয়নি।
এদিকে সংসদের বাইরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে সংসদ কমপ্লেক্সের সব ফটক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বাইরে যেতে চাওয়া সংসদ সদস্যদের কিছু সময় ভেতরেই অবস্থান করতে বলা হয়।
বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তার পদত্যাগের দাবিতে লোকসভার ভেতরে ‘ইস্তফা দো’ স্লোগান ওঠে। পরে অধিবেশন মুলতবি হলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দপ্তরে যান এবং দিনের কার্যক্রম শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। দিন শেষে লোকসভার প্রথম অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের বিভক্ত চিত্র। একসময় একই দলের সহকর্মীরা একই কক্ষে কয়েকটি আসনের ব্যবধানে বসেও পরস্পরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না রাখা এবং বিরোধীদের যৌথ আন্দোলনে একসঙ্গে অংশ না নেওয়া ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক