পরীক্ষাসংক্রান্ত অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতে নতুন মোড় নিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। বুধবার রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ডাকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। আন্দোলনকারীরা জানান, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তর মন্তর ছাড়ব না। যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, সেই দেশকে আমরা আবার জাগিয়ে তুলেছি।” শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলোও মাঠে নেমেছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিরোধী নেতারা।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়নের জন্য সরকারের কাছে ক্ষমা দাবি করেন। মঙ্গলবার তাকে বিক্ষোভস্থল থেকে আটক করা হলেও পরে মুক্তি দেওয়া হয়। বুধবার তিনি কালো পোশাক পরে সংসদে গিয়ে সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, দেশের প্রতিটি তরুণকে প্রভাবিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব রয়েছেন।
আন্দোলনের পটভূমি
গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) ও ‘পরজীবী’ হিসেবে মন্তব্য করলে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদ থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর সূচনা। পরবর্তীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান সংকট এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতাকে আন্দোলনের অংশ করা হয়। বর্তমানে সংগঠনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো অনুসারী রয়েছে। সোমবার সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার সময় পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা পাথর নিক্ষেপ করেছেন।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করেছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা একটি আবেদন শুনতে বুধবার অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যন্তর মন্তরে অবস্থানরত ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাব্য এএফপিকে বলেন, “আমি ভয় পেয়েছি। সোমবার পুলিশকে আন্দোলনকারীদের মারধর করতে দেখেছি। কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।”
ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) ও অন্যান্য পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের জবাবদিহি, সংস্কার এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারা বিশৃঙ্খলার নয়, সমাধানের দাবিদার।”
দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ ভারতের বিভিন্ন শহরেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন মোদি সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: এএফপি