যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি হামলার সময়কার ভয়াবহ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
ইরানি সাংবাদিক জাদ মৌগুয়িকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরঘচি বলেন, হামলার ঠিক আগে তিনি খামেনির উপ-প্রধান কর্মী আলী আসগর হিজাজির কার্যালয়ে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করছিলেন। এ সময় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় বিস্ফোরণটি ভবনের পাশেই আঘাত হানে। এতে ভবনের বাম পাশ ধসে পড়ে এবং ঘটনাস্থলেই নিহত হন হিজাজির সচিব। তবে ভবনের অন্য অংশে অবস্থান করায় তিনি ও কয়েকজন কর্মকর্তা প্রাণে বেঁচে যান।আরঘচি জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার পর বিম ও কাঠের স্তূপ সরিয়ে আলী আসগর হিজাজির হাত ধরে কোনোমতে বাইরে বেরিয়ে আসেন তারা। তখন পুরো এলাকায় একের পর এক লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চলছিল।
তিনি বলেন, সরকারি গাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরে এক পথচারীর সহায়তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমানে তেহরানে নিয়মিত গাড়ি পরিবর্তন করে চলাচল করছেন বলেও জানান তিনি। সাক্ষাৎকারে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ত্রুটির কথাও স্বীকার করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবি, অত্যন্ত নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র নীতি পরিষদ ও প্রতিরক্ষা পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ের যৌথ বৈঠক চলাকালে হামলা চালানো হয়। ফলে হামলার প্রথম দিনেই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
আরঘচি জানান, ওই ঘটনার পর তারা প্রায় তিন দিন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। খামেনির অবর্তমানে তার ছেলে মোজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পেলেও আরঘচির সাথে এখনও তার সাক্ষাৎ হয়নি। তবে এই ধারাবাহিকতা বহাল থাকা বিশ্ববাসীর কাছে তেহরানের কঠোর অবস্থান ও নীতি অপরিবর্তিত থাকার সুস্পষ্ট বার্তা দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরঘচি আরও বলেন, খামেনি আক্রান্ত হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার একটি আগাম পরিকল্পনা সংবিধানের ‘কোড ১১০’ অনুসারে তৈরি করাই ছিল। চলতি বছরের শুরুতে ওয়াশিংটনের সাথে হওয়া কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে আরঘচি বলেন, সাফল্যের আশা সামান্য হলেও কূটনীতির পথ বেছে নেওয়া দরকার ছিল, যেন ইরানকে কেউ দোষারোপ করতে না পারে। তিনি জানান, জেনেভায় শেষ দফা আলোচনায় চুক্তি প্রস্তাব দেওয়া হলেও ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা জানান ওয়াশিংটন হঠাৎ যুদ্ধংদেহী মনোভাব ধারণ করেছে। এরপরের দিন সকাল ৯টার পরপরই যৌথ আক্রমণ শুরু করা হয়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করে আরঘচি স্পষ্ট জানান, তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোকে আগে থেকেই সাবধান করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের তেল ও পারমাণবিক স্থাপনা বা শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানলে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত করা হবে এবং গোটা অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি অচল করে দেওয়া হবে। হাজার বছরের সভ্যতা ও শিয়া মতাদর্শের গভীরতা নির্দেশ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দুর্বল ভেবে আক্রমণ করলেও আত্মত্যাগের এই শক্তিকে সহজে পরাজিত করা সম্ভব নয়।