বিএনপি সরকারের ছয় মাসের শাসনামলে দেশে ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিকরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে এখন একটা মুক্ত পরিবেশ আছে। এটা কতদিন থাকবে, আমরা কেউ জানি না। ধীরে ধীরে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে সেই সংকোচন ঠেকাতে হবে—আপনাদের, আমাদের সবাইকে মিলেই।”
গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দাবিতে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করাকে ‘হঠকারিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, বিরোধী দল সংসদের ভেতরে ও বাইরে কথা বলবে—এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিরোধী দল রাস্তায় আন্দোলনে নামলে সেটিকে বাস ভাঙচুরের সঙ্গে যুক্ত করে মামলা বা গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি করা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক হবে।
সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রত্যাশা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও সাংবাদিকেরা নানা উপায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। মফস্বলের সাংবাদিক, মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক ও নাগরিক সাংবাদিকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কাজ করতে না দেওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলেছেন। সেই সময়ের হতাশা আমাদেরও আছে। অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল, কিন্তু অনেক কিছু আমাদের করতে দেওয়া হয়নি। আপনাদের সব সমালোচনা আমি সাদরে গ্রহণ করি। তারপরও বলব, আমি সাত মাস দায়িত্বে ছিলাম। এই সাত মাস কোনো স্বাভাবিক সময় ছিল না। তখন পুরো দেশকে স্থিতিশীল করতে আমাদের সব শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ওই সময়ে আমাদের কিছু কাজ করার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি। ফলে এখন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের দাবিগুলো আমরা বলতেও প্রায় ভুলে গিয়েছি।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কমিশনের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের সুরক্ষাসহ বেশ কিছু ভালো নীতি ও সুপারিশ ছিল। এগুলো বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।তিনি বলেন, গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব থাকা উচিত নয়। মালিকপক্ষ, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের স্বার্থের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের প্রভাবও গণমাধ্যমে কাজ করে। এসব প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আমরা একটা রেসপন্সিবল জার্নালিজম চাই। একই সঙ্গে রেসপন্সিবল পলিটিক্স চাই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ব্যক্তির ইচ্ছায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র টিকে থাকে না। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যত বেশি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হবে, দেশে গণতন্ত্রও তত বেশি শক্তিশালী হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার, স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আর পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না; সবাইকে মিলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন সহিংসতার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো গণমাধ্যমের নীতিমালা বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মতভিন্নতা থাকলেও সহিংসতার মাধ্যমে তার মোকাবিলা করা সমর্থনযোগ্য নয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) সারজিস আলম, সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন এমপি প্রমুখ।
আরো উপস্থিত ছিলেন, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম, নিউ এজের আজাদ মজুমদার, ফকরুল আলম কাঞ্চন, চ্যানেল ২৪ এর মাকসুদ উন নবীসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনের সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন।