চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শনিবার নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তিব্বত অঞ্চলে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৬৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত বুধবার পাহাড়ি ঢল ও সুনামির মতো ধেয়ে আসা কাদা-পানির স্রোতে হিমালয়ের পাদদেশের কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। দুর্গম এলাকাগুলোতে চতুর্থ দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন নেপাল ও চীনের উদ্ধারকর্মীরা।
দুই দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এরই মধ্যে ৬৮২টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, তিব্বত ও নেপাল থেকে নদীর স্রোতে ভেসে কিছু মরদেহ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারে। সে কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নেপাল স্কাউট ডিজাস্টার রেসপন্স টিমের কর্মী কাওয়ান কৈরালা জানান, হাঁটুসমান ঘন ও ভারী কাদার কারণে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষ ও মরদেহ খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
টানা ১৮ ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালানোর পর তিনি বলেন, স্বজনরা তাঁদের প্রিয়জনের মরদেহ হলেও ফিরে পেতে চান। কিন্তু অতিরিক্ত কাদার কারণে উদ্ধারকারীদের পক্ষে অনেক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। নেপালে এর আগে অনেক বন্যা দেখলেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি কখনো দেখেননি বলে জানান।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রচণ্ড গতিতে বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত নেমে আসে। এটিই ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ ও বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। বন্যার পানিতে নদীতীরবর্তী প্রায় সব জনপদই ধ্বংস হয়ে গেছে। নেপালের নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা বুদ্ধি রাম ডাঙ্গোল বলেন, নদীর পাশের সব ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
নুয়াকোটের বির্দুর এলাকায় একটি সেনা ক্যাম্পে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বজনদের নাম খুঁজতে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। নিজের ১৮ বছর বয়সী ছেলের সন্ধানে সেখানে আসা কালকা সারদা জানান, তাঁর ছেলে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। ছেলেটি জীবিত থাকলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই যোগাযোগ করত—এমন আশঙ্কায় তিনি এখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে শুধু ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নিখোঁজদের তালিকায় ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ট্র্যাকার এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
চরম মানবিক সংকট, প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহায়তা, রেড ক্রসের তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল শনিবার জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকার অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো মানুষের জীবন রক্ষা ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো।
দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে ড্রোনসহ বিশেষ প্রযুক্তি চেয়েছে নেপাল। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়া ঠেকাতে ফরেনসিক কিট ও ফ্রিজার ইউনিটের জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে দেশটি।
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকাতেও পরিস্থিতি এখনো সংকটাপন্ন। নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় চীন জিরোং অঞ্চলে তাদের উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। অন্যদিকে নেপালের ত্রিশূলী-৩এ ও ত্রিশূলী-৩বি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে আটকে থাকা প্রায় ১০০ জনকে উদ্ধারে সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। তাঁদের সহায়তায় ভারতের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দলও নেপালে পৌঁছেছে।