জাতীয়

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার বন্ধ হবে না

detaillogo
ডেস্ক নিউজ
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৫
PostImage

১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলার বিচারকাজ স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।


নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলার বিচারকাজ স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আসামির বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে কোনো আইনি বাধা থাকবে না।


হাইকোর্ট বলেছেন, বিচার শেষ করার ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব হলেও ওই সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেই মামলার কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর বা বাতিল হবে না।


‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।


রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সময়ে মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও কোনো অবস্থাতেই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা যাবে না। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক।

আদালত আরও বলেন, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক প্রক্রিয়া বাতিল বা স্থগিত হওয়ার মতো কোনো আইনগত পরিণতির বিধান রাখা হয়নি।


মামলার পটভূমি

প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে আসামি পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।


ওই ঘটনায় ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আদালত পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।


এরপর ২০১১ সালের ৮ মে পাভেল হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। তাঁর দাবি ছিল, মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত হওয়ার পরও নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি।

পাভেলের দাবি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারা অনুযায়ী মামলা গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকেও দেখা যায়, মামলাটি তখনও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিল।


এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে ৩১ক ধারা অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাভেলের দাবি ছিল, এ ধরনের প্রতিবেদনও দেওয়া হয়নি। তাই আইন লঙ্ঘন করে মামলার বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যায় না।


পরে বিচার স্থগিতের আবেদন করলে হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে ওই স্থগিতাদেশ কয়েক দফা বাড়ানো হয়।


হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

পরবর্তীতে উভয়পক্ষের যুক্তি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট পাভেলের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।

রায়ে আদালত বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন নয় এবং রিটকারী অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী আদেশগুলো গোপন করেছেন, যা রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত কাজ বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।


আদালত আরও বলেন, বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য রিটকারীর পক্ষ থেকে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা তাঁর মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়। কারণ, রিটকারীর পক্ষে এ বিষয়ে কোনো আইনি অধিকার সৃষ্টি হয়নি।

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনের বিধান বিবেচনায় রুলের কোনো সারবত্তা নেই উল্লেখ করে হাইকোর্ট তা খারিজ করেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।


আদালতে পাভেলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম. এইচ. রশীদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।