বাঁশের চটা ঠেলে শলা বানানোই তরুণ শেখ শরীফুলের জীবনের নিত্যদিনের গল্প। বাঁশের শলার সঙ্গে যেন তার বারোমাসের সখ্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা—বাঁশ কাটা, চটা তৈরি, শলা বানানো আর তা বিক্রির মধ্য দিয়েই ঘোরে তার সংসারের চাকা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তাই ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পাগলা-দেয়াপাড়া এলাকায় শরীফুলের বসবাস। বাবা ইলিয়াজ শেখ পেশায় দিনমজুর। দিনমজুরির পাশাপাশি বাবা-ছেলে দুজনেই বিয়েবাড়ি কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করেন। এর পাশাপাশি মালিকের অধীনে বাঁশ কেনা, কাটা, বহন ও বিক্রির কাজের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত শরীফুল।
ছোট ভাই ও মা-বাবাকে নিয়ে অভাবের সংসারে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে বেশ আগেই বাঁশের এই কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন তিনি। শরীফুলের মতো ফকিরহাটের আরও অনেক মানুষ বাঁশ কেনাবেচা ও বাঁশজাত বিভিন্ন উপকরণ তৈরির সঙ্গে জড়িত।
শরীফুল বলেন, ফকিরহাটে বাঁশের চাহিদা রয়েছে নানা কাজে। ঘর-গৃহস্থালির ব্যবহার ছাড়াও মাছের ঘেরের বেড়া, জমির আইল, বিভিন্ন ধরনের বেড়া এবং পানের বরজে শলা তৈরিতে বাঁশের প্রয়োজন হয়। এ কারণে বাঁশের কেনাবেচা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা।
প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশের ঐতিহ্যবাহী অনেক ব্যবহার কমে এলেও ফকিরহাটে বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার এখনো টিকে আছে। বরং বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের কারণে বাঁশের চাহিদা ধরে রেখেছে স্থানীয় বাজার। চাহিদা মেটাতে ফকিরহাট থেকে বাঁশের চালান যায় মোল্লাহাটের চাঁদেরহাট, রামপালের ফয়লাহাট, ভাগা, মোংলা, বাগেরহাট সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়।
চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁশকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের পেশা। কেউ বাঁশ কেনাবেচা করেন, কেউ বাঁশ কাটেন, কেউ তৈরি করেন খুঁটি কিংবা পানের বরজের শলা। আবার কেউ বাঁশ পরিবহন বা বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির কাজে যুক্ত। অনেকেই এসব কাজকে বারোমাসি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ফকিরহাটের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি পল্লীতেই চোখে পড়ে বাঁশঝাড়। সেখান থেকে বাঁশ কেটে কাঁধে করে বের করা, ভ্যান, নসিমন কিংবা করিমনে করে হাটে নেওয়া—প্রতিটি ধাপেই যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ। বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার সরঞ্জাম, মুরগির বাচ্চা ঢাকার উপকরণ, খুঁটি, বেড়া এবং ঘর-গৃহস্থালির নানা সামগ্রী তৈরিতেও রয়েছে তাদের শ্রম।
এভাবেই বাঁশকে কেন্দ্র করে ফকিরহাটে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় নানা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। বাঁশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব পেশাকে আঁকড়ে ধরে অনেকেই সংসারের ব্যয় মেটাচ্ছেন, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। তাদের কাছে বাঁশ শুধু একটি গাছ নয়—এটি জীবিকার অবলম্বন, বছরের বারো মাসের সঙ্গী।