অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর এক দিনের মাথায় তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ইশরাক হোসেনকে চিৎকার করে ‘এই ধর, ধর, ধর...’ বলতে শোনা যায়। এ সময় তাঁর হাতে একটি আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। শনিবার বিকেল ৫টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে ভিডিওটি শেয়ার করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী। পরে অবশ্য সেটি মুছে ফেলা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি অস্ত্র হাতে কাউকে ভয় দেখাননি বা গুলি করেননি। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই ওই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তার পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন জানান, গত ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলা ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ পেয়ে আসছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে মাদকসংক্রান্ত সহিংসতায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভাও করেন। মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট থানাকে আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দেওয়া হয়েছিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
অস্ত্র প্রদর্শনের কারণ ব্যাখ্যা করে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে তাঁর নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। মাদক কারবারিরা ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে বলেও আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। এ সময় সম্ভাব্য হামলা ও জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অস্ত্র যথাস্থানে রাখা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও দাবি করেন, প্রদর্শিত আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেওয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল। বিবৃতিতে তাঁর ভাষ্য, ঘটনার পর গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় সন্দেহভাজন মাদকের আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়।
তবে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযানে অংশ নেওয়া এবং এ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের পর তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।