গলার সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতির মতো ছোট একটি গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদ্স্পন্দন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কার্যক্রমে এই গ্রন্থির ভূমিকা রয়েছে। থাইরয়েড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি হরমোন নিঃসৃত হলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি প্রধানত থাইরক্সিন (T4) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3) হরমোন তৈরি করে। প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি হলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং বেশি হরমোন তৈরি হলে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজমে সাধারণত ওজন বেড়ে যাওয়া, ক্লান্তি, ঠান্ডা বেশি লাগা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্স্পন্দন ধীর হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমে ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম, গরম লাগা, অস্থিরতা, ঘন ঘন পায়খানা ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে অটোইমিউন রোগ, আয়োডিনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নারীদের মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
থাইরয়েডের সমস্যা হলে কী খাবেন?
থাইরয়েডের নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিকল্প কোনো খাবার নয়। তবে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োডিনযুক্ত খাবার
থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে আয়োডিন প্রয়োজন। আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, মাছ, ডিম ও দুধ আয়োডিনের উৎস হতে পারে। তবে অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়োডিনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
সেলেনিয়ামসমৃদ্ধ খাবার
থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সেলেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, ডিম, মাংস, দুধ ও দুধজাত খাবারসহ বিভিন্ন খাবারে সেলেনিয়াম পাওয়া যায়।
জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার
থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য জিঙ্কও প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। মাংস, ডিম, কুমড়ার বীজ, বাদামসহ বিভিন্ন খাবার থেকে জিঙ্ক পাওয়া যায়।
ফল ও সবজি
ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি খাওয়া ভালো। পেয়ারা, আমলকি, লেবু, কমলা, কাঁচামরিচসহ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
এ ছাড়া পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, দুধ ও দুধজাত খাবারসহ বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।
কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেই বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালংশাক বা সয়াবিন পুরোপুরি বাদ দিতে হবে-এমনটি নয়। এসব খাবার পরিমিত পরিমাণে সাধারণত খাওয়া যায়। বিশেষ করে রান্না করা ক্রুসিফেরাস সবজি স্বাভাবিক পরিমাণে খেলে অধিকাংশ মানুষের সমস্যা হয় না।
তবে হাইপোথাইরয়েডিজমের ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। লেভোথাইরক্সিন সাধারণত খালি পেটে খেতে বলা হয় এবং খাবার, ক্যালসিয়াম বা আয়রনযুক্ত সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে ব্যবধান রাখতে হয়। কোন সময় ও কীভাবে ওষুধ খাবেন, তা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুসরণ করা উচিত।
ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলাও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
থাইরয়েডের সমস্যা শুধু খাবার পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হাইপোথাইরয়েডিজমে অনেকের নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হয়, আবার হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসাও রোগের কারণ ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।
তাই থাইরয়েডের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী TSH, T4 বা অন্যান্য পরীক্ষা করা উচিত।