ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর অব্যাহত হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে ফ্রান্স। এরই মধ্যে সৌদি আরবে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মোতায়েন শুরু করেছে দেশটি। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাসকাল কনফারেক্স। তিনি বলেন, সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলা শুধু দেশটির নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং এর প্রভাব ফ্রান্সের ওপরও পড়তে পারে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে ইউরোপকেও গুরুতর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গত ২৪ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ করে ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম করিডোর সুরক্ষায় সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই সৌদি আরবে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মোতায়েন করা হচ্ছে। এর আগে গত মাসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছিলেন, লোহিত সাগরের তীরবর্তী বন্দর শহর ইয়ানবুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে সেনাসদস্য ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানো হবে। শহরটি জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সে সময় ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, এই মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য ইরান যুদ্ধের প্রভাব সীমিত রাখা।
এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, ইয়ানবুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈন্য, রাডার ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক সম্পদ পাঠানো হচ্ছে। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, এ পদক্ষেপের অর্থ ফ্রান্স কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে না। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর ইউরোপে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি রপ্তানি করতে পারছে সৌদি আরব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে ইরাকে অবস্থিত ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধারা ড্রোন হামলা চালিয়ে সংশ্লিষ্ট পাইপলাইনের ক্ষতি করে। এর ফলে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া গত সপ্তাহে হুথিদের এক হামলায় ইয়ানবুতে অবস্থিত ‘ইয়াসরেফ’ শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শোধনাগারটির কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয় সৌদি আরব। দেশটিতে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে এবং ডিজেল সরবরাহের সংকট আরও তীব্র করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে।
গত সেপ্টেম্বরে ম্যাক্রোঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইয়ানবুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্রান্স রাফাল যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে পারে কি না। জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। ওই অঞ্চলে কিছু যুদ্ধবিমান ইতিমধ্যে অবস্থান করছে বলেও জানান তিনি।
পারস্য উপসাগর উপকূলের সৌদি তেল উৎপাদন কেন্দ্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ মাইল বিস্তৃত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনটি বর্তমান সংঘাতের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেই সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
আশির দশকের শুরুর দিকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ায় বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে এই পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছিল।
সূত্র: এএফপি, ফার্স্টপোস্ট