ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, দল দায়িত্ব দিলে তিনি মেয়র নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত। তবে দল অন্য কাউকে প্রার্থী করলে তাকেও জয়ী করতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন তিনি।
রোববার (৪ অক্টোবর) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র নির্বাচনসহ ঢাকা-৬ আসনের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন ইশরাক হোসেন। মেয়র নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইশরাক হোসেন বলেন, দলের যেকোনো প্রয়োজনে তিনি এগিয়ে আসবেন। দল যদি মনে করে তাকে মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী করবে বা কোনো কৌশলগত কারণে তার প্রার্থিতা প্রয়োজন, তাহলে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।
তিনি বলেন, দল যদি মনে করে অন্য কেউ প্রার্থী হবে, তাহলে তাকেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। নিজের দলের প্রার্থীকে জয়ী করতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
ঢাকা-৬ আসনের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে ইশরাক বলেন, তার কাছে থাকা বুকলেটে এলাকার নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক সমস্যাগুলোর মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্যতম। কিছু এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বর্ষাকালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যা ওয়াসার আওতাধীন, সেটিও বিভিন্ন জায়গায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়েও কথা বলেন ইশরাক। তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসনের কয়েকটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর রেড জোন বা উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু জায়গায় সিটি করপোরেশন কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
রাস্তার সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় অনেক রাস্তা অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সংশ্লিষ্ট অনেক ঠিকাদার চলে যাওয়ায় কাজগুলো শেষ হয়নি। এতে বছরের পর বছর মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে এসব সমস্যার বেশির ভাগেরই ইতিমধ্যে সমাধান হয়েছে এবং কিছু জায়গায় ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন না হলেও কিছু এলাকায় এর অবনতি হয়েছে বলে জানান ইশরাক। এ বিষয়ে তিনি নিয়মিত পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাদের অবহিত করেন বলে জানান।
সড়কবাতির অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশেষ করে পুরান ঢাকার অনেক সরু ও চিপা রাস্তা রয়েছে। একটি সময়ের পর এসব জায়গায় হাঁটা বা চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি। তাই দ্রুত সড়কবাতি মেরামতের বিষয়টি তারা তুলে ধরেছেন।
বৃষ্টির সময় বিভিন্ন স্থানে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইশরাক। তিনি বলেন, পানি জমে গেলে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে গুরুতর অভিযোগও এসেছে।
ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি রোধে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ওয়াসা বা সিটি করপোরেশন ভালো উত্তর দিতে পারবে। কারণ রাস্তার মালিক সিটি করপোরেশন এবং ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ওয়াসা দেখে। তবে কোনো না কোনো কার্যকর পন্থা বের করতে হবে।
এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন ইশরাক। পাশাপাশি রাস্তার পাশে থাকা বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ও সিসিটিভি ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট যানজট প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, যানজট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশ ও প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক কমিটি করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বৈঠক হচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও এতে যুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি ওই কমিটিতে নেই। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। শুধু নীতিমালা করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নও করতে হবে।
কিছু এলাকায় রিকশার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, জোনভিত্তিক সীমিতসংখ্যক রিকশার অনুমতি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। নিয়ন্ত্রিতভাবে রিকশা চলাচল করলে মূল সড়কে যানজট কমানো সম্ভব হতে পারে।
অটোরিকশা আমদানি ও উৎপাদন বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, বাস্তবে এক দিনে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বড়সংখ্যক জনগোষ্ঠী এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং। তবে সরকার এ বিষয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে।
ইশরাক বলেন, অটোরিকশা আমদানির বিষয়টি তিনি মন্ত্রিসভায় আলোচনা করবেন। সরকারি সদস্য হিসেবে সংসদে কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মন্ত্রিসভায় আলোচনা করা হয়।
বুড়িগঙ্গা নদীদূষণ প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং অনেক জায়গায় ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ করতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, শুধু কলকারখানার বর্জ্য নয়, বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ঠিক করতে হবে। এসব লাইন সঠিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে পরিশোধনের পর পানি নদীতে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে ইশরাক বলেন, তার নীতি হলো আগে একটি বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনের সময়ও তিনি বলেছিলেন, ঢাকা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লন্ডন, ইউরোপ বা আমেরিকা হবে না। আগে ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ঢাকার উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় সাতটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪০টির বেশি সেবাদানকারী সংস্থা কাজ করে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
ইশরাক আরও বলেন, কয়েকটি সড়কে হকার ও অবৈধ স্থাপনার কারণে চলাচলের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জায়গা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ধোলাইখাল ও লক্ষ্মীবাজারের কিছু অংশে এ সমস্যা ছিল। কিছু স্থাপনা আবার ফিরে এলেও স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে।
ধোলাইখালের ট্রাকস্ট্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর দাবি অনুযায়ী ট্রাকস্ট্যান্ডটি সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হবে। নদীর ওপারে নির্দিষ্ট স্থানে এটি স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ধোলাইখালের ট্রাকস্ট্যান্ড শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সন্ধ্যার পর পুরো সড়ক ট্রাকে পরিণত হয়। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলো নিয়ে তারা কাজ করছেন। দক্ষিণ ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও কাজ চলছে।
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করার জন্য তথ্য দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, জোনাল কর্মকর্তা, ওয়ার্ড পরিদর্শক ও কনজারভেন্সি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনও তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনাও তারা নিয়মিত পাচ্ছেন। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকা-৬ আসনের নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।