রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগে অবস্থিত দেওয়ানবাগ দরবার শরিফ। আধ্যাত্মিকতা ও মানবসেবার নাম দিয়ে পরিচালিত হলেও এই দরবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এক বিশাল ও রহস্যময় সম্পদের পাহাড়। একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য— যার বড় একটি অংশই অপ্রকাশিত এবং সন্দেহজনক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের হাতে এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। রাজধানীসহ দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় জমি, ডজনখানেক ভবন এবং বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মিলেছে। তিন ছেলের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে মেজ ছেলে আরসাম কুদরত-এ-খোদার ২৪টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বিএফআইইউর তথ্যমতে, কুদরত-এ-খোদার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগদে জমা হয়েছে ১৫ কোটি টাকারও বেশি। এসব অর্থ দরবারের উন্নয়নে ব্যয় না করে এফডিআর, জমি ক্রয় ও ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ‘সিস্টেক ইউনিম্যাক্স’, ‘আইনেক্স আইডিয়া’ এবং ‘গৃহ ঘড়ি’ নামে তিনটি রহস্যময় প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে তার অ্যাকাউন্টে ২ কোটি টাকা স্থানান্তরের তথ্য মিলেছে, বাস্তবে যেগুলোর কোনো অফিস বা অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মতিঝিলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ‘বাবে রহমত’ ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক বহুতল ভবন ও কমপ্লেক্স। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ২০২৪ সালের মার্চ মাসে কুদরত-এ-খোদা ৫ কাঠার একটি প্লট কেনেন, যার শুধু হস্তান্তর ফি ছিল ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া এল ব্লকে আরও ৫ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। মতিঝিল, আরামবাগ, মগবাজার, মেরাদিয়া, জুরাইন, মিরপুর ও দক্ষিণখানে রয়েছে অর্ধ ডজন ভবন এবং কয়েক একর জমি। মানিকদিতে ৭ কাঠা জমিতে একটি সাততলা ভবনের কাজ চলছে।
পীরের জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবীর বিরুদ্ধে উঠেছে আরও ভয়ংকর অভিযোগ। মিরপুরে ‘ইন্টারন্যাশনাল আশেকে রাসুল অর্গানাইজেশন’ খুলে তিনি সাধারণ মানুষকে ‘সরাসরি জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার’ আশ্বাস দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরপুরের এক বাড়ি মালিক জিয়াউদ্দিন রিপনের সঙ্গে ফ্ল্যাট বায়নার চুক্তি করে পরে পুরো ভবন দখলের চেষ্টা চালান মাহবুবী। টাকা না দিয়ে উল্টো ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না করায় রিপনকে জুলাই অভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলায় আসামি করে তিন মাস জেল খাটানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দেওয়ানবাগ শরিফকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যেও ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। কুদরত-এ-খোদার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ কোটি টাকারও বেশি নগদে জমা হয়েছে। এসব অর্থের বড় অংশই ধর্মীয় উন্নয়নের কাজে ব্যয় না করে এফডিআর এবং ব্যক্তিগত সম্পদ কেনায় ব্যবহার করা হয়েছে।
দেওয়ানবাগ শরিফের মুখপাত্র তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন,সম্পদগুলো পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত এবং ব্যবসায়িক আয় থেকে করা। তবে বিএফআইইউর জব্দকৃত অ্যাকাউন্ট এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়গুলো বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। পীরের জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবীর বিষয়ে তিনি জানান, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে জীবদ্দশাতেই দরবার থেকে ত্যাজ্য করেছিলেন পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা।