সারাদেশ

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি লাখো মানুষ

detaillogo
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই ২০২৬, ১৪:০১
PostImage

টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।


শনিবার (১১ জুলাই) ভোরে বৃষ্টি কিছুটা থেমে থাকায় পানি কমার আশা জাগলেও দুপুরের পর আবারও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে প্লাবিত এলাকার পানি আরও বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির। অনেক এলাকায় রান্নার মতো শুকনো জায়গা নেই, আবার কোথাও নিরাপদ পানির উৎস পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নৌকা ও ঠেলাগাড়িতে করে মানুষ খাবারের সন্ধানে ছুটছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।


শনিবার সকাল থেকেই জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নৌকাযোগে দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনো খাবার, ওষুধ, মোমবাতি ও নিরাপদ পানি বিতরণ শুরু করেছে। চার দিন পর মিলল নিখোঁজ মাদরাসাছাত্রের মরদেহ, বন্যার মধ্যে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনার অবসান ঘটেছে। ঈদগাঁও ও রামুর সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী মাদরাসাছাত্র সাজেদের মরদেহ চার দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে।


শনিবার সকালে ফুলেশ্বরী নদীর ঈদগাঁওয়ের গজালিয়া এলাকায় ভাসমান অবস্থায় স্থানীয়রা মরদেহটি দেখতে পান। পরে সেটি উদ্ধার করা হয়। ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল জাহান চৌধুরী জানান, নিহত সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং চরপাড়া নুরানি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ফুলেশ্বরী খালের প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে সে নিখোঁজ হয়।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দল ইতোমধ্যে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে।


তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের মতে, দিনের বেলায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে এবং মাতামুহুরী নদীর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী একদিনের মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে।

গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়াসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী নদীসংলগ্ন এলাকায় বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডুবে গেছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।


কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামুর কাঠিরমাথা ও চাইল্যাতলীসহ কয়েকটি এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক এখনো পানির নিচে থাকায় ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান জানান, উপজেলায় এখনো দুই থেকে আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। তাদের জন্য ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে এবং সেখানে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, বন্যায় জেলায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন এবং বিভিন্ন ঘটনায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ২০ লাখ টাকা ও ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা রোববার বা সোমবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের জন্যও জেলা প্রশাসন আবেদন করেছে।


কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সন্ধ্যার পর আবারও ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।


প্রশাসনের আশা, বৃষ্টির প্রবণতা কমলে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করবে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, হাজারো পানিবন্দি মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা। পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজারবাসীর দুর্ভোগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।